আব্দুলা নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়মের পাহাড়: নিঃশ্বেষ হচ্ছে শত শিশুর ভবিষ্যৎ, তদন্তের আকুল আরতি
খলিলুর রহমান রানা,নরসিংদী থেকেঃ
যেখানে গড়া হয় জাতির ভবিষ্যৎ, যেখানে আলোর মশাল জ্বালানোর কথা—নরসিংদীর বেলাব উপজেলার আব্দুল্লাহ নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আজ যেন এক আঁধারপুরীতে পরিণত হয়েছে। চরম অনিয়ম, সময়ের তোয়াক্কা না করা, দায়িত্বে অবহেলা আর শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতায় প্রতিনিয়ত ধুলোয় মিশে যাচ্ছে অবুঝ শত শিশুর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।
শুধু তা-ই নয়, বিদ্যালয়ের অফিস রুমে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে আছেন নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বাচ্চু মিয়া। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টায় যে পাঠশালার দরজা খুলে শিশুর কলকাকলিতে মুখরিত হওয়ার কথা, সেখানে প্রতিদিন গড়ায় সাড়ে ৯টার বেশি। আর বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটের সমাপনী ঘণ্টার অনেক আগেই, ঘড়ির কাঁটা ৩টা ৪৫ স্পর্শ করতেই তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বিদ্যালয়ের ফটকে। সারাদিনে নামে মাত্র দুই-তিনটি ক্লাসের অভিনয় শেষে স্থবির হয়ে পড়ে সব শিক্ষা কার্যক্রম। পুরো একটি দিন এসে অবুঝ শিশুরা কী শিখলো, সে উত্তর কারোরই জানা নেই।
এসব গুরুতর অনিয়মের জবাব চাইতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেন তা শিউরে ওঠার মতো। সব শিষ্টাচার ও পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে চরম দম্ভের সঙ্গে তিনি বলেন, \"বিদ্যালয় আমার, স্বাধীনতাও আমার। আপনারা সাংবাদিকরা লেখেন, এতে আমার কিছু যায় আসে না।\" নিজ সন্তানদের বিদ্যালয়ে এনে পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁর সস্তা যুক্তি, \"আমার দুটি বাচ্চা, আমি কি তাদের এতিমখানায় রেখে আসবো?\" শুধু তা-ই নয়, কোমলমতি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত দুপুরের খাবার নিজ সন্তানদের খাওয়ানোর চরম নৈতিকতাবিহীন কাণ্ডকেও অত্যন্ত স্বাভাবিক দাবি করে তিনি বলেন, \"আমি স্কুলের শিক্ষক, আমার বাচ্চারা খেতেই পারে—এটাই স্বাভাবিক। আপনি পারলে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে বিষয়টি অবহিত করেন, উনি নিষেধ করলে আমি আর বাচ্চা নিয়ে স্কুলে আসবো না এবং তাদের কোনো খাবার খেতে দেব না।\" শিক্ষকদের এমন লাগামহীন আচরণে ক্ষুব্ধ সচেতন মহল।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জেসমিন আক্তারের কাছে দেরিতে আসার কারণ জানতে চাওয়া হলে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কণ্ঠে তিনি উত্তর দেন, \"স্কুলে আসতে ১০-২০ মিনিট দেরি হতেই পারে, এটা দোষের কিছু নয়।\" অকালেই স্কুল ছুটি দেওয়ার বিষয়ে আক্ষেপ না করে তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন, \"আমাদের বাসায় একটু কাজ ছিল, এ জন্য আমরা আধা ঘণ্টা আগে স্কুল ছুটি দিয়ে দিয়েছি।\" শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া এভাবে মনগড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না—জানতে চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, সবকিছু শিক্ষা অফিসারকে জানিয়ে করা সম্ভব নয়। স্থানীয়দের বুকে জমাট বেঁধেছে তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণা। বাসিন্দারা চোখের সামনে দেখছেন একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্মের নীরব ধ্বংসস্তূপ। স্থানীয় বাসিন্দা কাদের মিয়া আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, \"তারা মনগড়ামতো স্কুলে আসে এবং মনগড়ামতো চলে যায়। ১০টা-সাড়ে ১০টায় এসে এক-দুটি ক্লাস নিয়ে তারা ক্লাসরুমে বসে আড্ডা দেন।\"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করেই প্রতিদিন সময়ের আগেই বিদায় নেন শিক্ষকেরা। সম্প্রতি সহকারী শিক্ষক জেসমিন আক্তারের একটি ভিডিও মেঘনা টেলিভিশনের হাতে এসেছে, যেখানে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের প্রতি বিন্দুমাত্র নজর না দিয়ে ক্লাসের হাই বেঞ্চে পা তুলে বসে ফোনে কারোর সাথে হেসে হেসে গল্পে মেতে আছেন তিনি। কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ যখন এভাবে চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তখন নীরব ভূমিকায় প্রশাসন।