NTV Logo

প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৪ PM

প্রিন্টের তারিখ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৬ AM

কাশিমপুরের পর টোক ভূমি অফিসে লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ

কাশিমপুরের পর টোক ভূমি অফিসে লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ

কাশিমপুরের পর টোক ভূমি অফিসে লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ।প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কি চাপা দেওয়া যাবে অনিয়মের চিত্র?

গাজীপুরের বিভিন্ন ভূমি অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যখন প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়েই সামনে এসেছে কাপাসিয়ার টোক নয়ন বাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কথিত ঘুষ-বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র।

সম্প্রতি গাজীপুরের কাশিমপুর ভূমি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিভাগীয় তদন্ত চলার তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যেই টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার বিরুদ্ধে লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং কথোপকথনের ভিডিও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—গাজীপুরের ভূমি অফিসগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে?

আরও বিস্ময়ের বিষয়, আগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর অভিযোগের সরাসরি ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।

তবে প্রশ্ন একটাই—প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কি লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগের সত্যতা আড়াল করা সম্ভব?

কাশিমপুরের পর টোক—তাহলে কি সমস্যা ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থায়?

সম্প্রতি কাশিমপুর ভূমি অফিসে প্রকাশ্য অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে উঠে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ।

একই জেলার একের পর এক ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় সচেতন মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে—ভূমি অফিসের অনিয়ম কি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ড, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা?

লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ, হাতে ভিডিও!

টোক নয়ন বাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ—নামজারি, জমাভাগ ও ভূমি উন্নয়ন কর সংক্রান্ত কাজকে কেন্দ্র করে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।

এর মধ্যে প্রায় ১ একর ৫০ শতাংশ বন্দোবস্তকৃত জমির নামজারি সংক্রান্ত একটি ঘটনায় এক লাখ টাকা দাবির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের কাছে থাকা ভিডিওতে বাবলু মিয়ার সামনে সেবাপ্রার্থীদের বসে কথা বলতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ১,০০,০০০ টাকা অঙ্কটি টাইপ করে দেখানোর দৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ভিডিওতে তাকে কথিতভাবে বলতে শোনা যায়—

«“খাজনাও তো অনেক হইব। খাজনা-টাজনাসহ একবারে এইডা নিমু, পুরা।”»

এখানেই শেষ নয়।

সেবাপ্রার্থী অর্থের পরিমাণ বেশি হওয়ার কথা বললে বাবলু মিয়ার কথোপকথনে উঠে আসে আরও একটি রহস্যজনক বক্তব্য—

«“আমরা তো বাস করি সাগরে... নদীর পানি সাগরে নিয়া ঢালুন লাগে, ঝামেলা হইল ঐ জায়গায়।”»

এই কথার প্রকৃত অর্থ কী—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

‘অফিসারের বাইরে কিছু কইয়া পারুম না’—অভিযোগের নেপথ্যে কারা?

ভিডিওতে বাবলু মিয়াকে ‘অফিসার’-এর প্রসঙ্গ তুলতেও শোনা যায় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তিনি কথিতভাবে বলেন, তিনি চাকরি করেন এবং অফিসারের বাইরে কিছু বলতে পারেন না।

এখন প্রশ্ন—‘অফিসার’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?

তিনি কি শুধু নিজের দায়িত্বের কথা বলেছেন, নাকি কথিত অর্থের ভাগাভাগির কোনো ইঙ্গিত দিয়েছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর বের করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কারণ একজন মাঠপর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ উঠলে শুধু তার ব্যক্তিগত বক্তব্য গ্রহণ করলেই তদন্ত শেষ হতে পারে না।

প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি, কিন্তু মূল প্রশ্নের উত্তর কোথায়?

আগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাবলু মিয়া বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অভিযোগ অস্বীকার করা এবং অভিযোগের মূল প্রমাণের নিরপেক্ষ তদন্ত—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

যদি ভিডিওটি মিথ্যা বা সম্পাদিত হয়ে থাকে, তাহলে তা প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা হোক।

যদি এক লাখ টাকা সরকারি ফি ও বৈধ খরচের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সরকারি নির্ধারিত ফি-এর তালিকা ও হিসাব প্রকাশ করা হোক।

আর যদি ওই অর্থ সরকারি ফি না হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কেন দাবি করা হয়েছিল—তার তদন্ত হওয়া জরুরি।

কাশিমপুরে ব্যবস্থা হলে টোকে তদন্ত নয় কেন?

সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।

কাশিমপুর ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পর যদি প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে এবং বিভাগীয় তদন্ত করতে পারে, তাহলে টোক ভূমি অফিসের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে একই মানদণ্ডে তদন্ত করা হবে না কেন?

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসন চাইলে—

- সংশ্লিষ্ট নামজারি ফাইল পরীক্ষা করতে পারে;
- সরকারি ফি ও কথিত আদায়ের অঙ্ক তুলনা করতে পারে;
- সেবাপ্রার্থীদের বক্তব্য নিতে পারে;
- ভিডিও ফুটেজের ফরেনসিক পরীক্ষা করতে পারে;
- ভূমি অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করতে পারে;
- কর্মকর্তা ও দালালদের কথিত যোগাযোগ অনুসন্ধান করতে পারে;
- পূর্বের বিভাগীয় অভিযোগ ও তদন্তের নথি পর্যালোচনা করতে পারে।

এগুলো করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

অতীতের অভিযোগও কি তদন্তের আওতায় আসবে?

স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে বাবলু মিয়ার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের সরকারি নথি যাচাই করে চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

যদি সত্যিই তার বিরুদ্ধে অতীতে বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে সেই নথি প্রকাশ করে জনগণকে জানানো উচিত—কী অভিযোগ ছিল, তদন্তে কী পাওয়া গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

কারণ একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না হয়, তাহলে দায় শুধু ব্যক্তির নয়—তদারকি ব্যবস্থারও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভূমিসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বন্ধ হবে কবে?

নামজারি, জমাভাগ, খাজনা, বন্দোবস্ত ও ভূমির রেকর্ড—এসব সাধারণ মানুষের মৌলিক নাগরিক সেবার অংশ।

একজন কৃষক, প্রবাসী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা উত্তরাধিকারী যখন নিজের জমির বৈধ কাগজপত্র ঠিক করতে ভূমি অফিসে যান, তখন তাকে যদি কথিত ঘুষের চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে সেটি শুধু দুর্নীতির অভিযোগ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট।

কাশিমপুরের ঘটনায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর টোক ভূমি অফিসের অভিযোগ সামনে আসায় এখন গাজীপুরের অন্যান্য ভূমি অফিসেও একযোগে নজরদারি ও বিশেষ অডিট করার দাবি উঠেছে।

প্রশাসনের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা

টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা সাংবাদিকের প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি বা অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়।

তদন্তই পারে সত্য বের করে আনতে।

তাই গাজীপুর জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—কাশিমপুরের মতো টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।

এক লাখ টাকা দাবির অভিযোগের ভিডিও যাচাই করা হোক। ‘অফিসার’ প্রসঙ্গে কথোপকথনের ব্যাখ্যা নেওয়া হোক। কথিত অর্থের কোনো লেনদেন হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হোক। অতীতের অভিযোগ ও বিভাগীয় নথি পরীক্ষা করা হোক।

অভিযোগ মিথ্যা হলে বাবলু মিয়া তদন্তের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। আর অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খুলবে।

প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাময়িকভাবে বিতর্ক থামানো যেতে পারে; কিন্তু প্রমাণ, নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

পরবর্তী পর্বে থাকছে—টোক ভূমি অফিসের কথিত ঘুষের রেট, দালালচক্র, বড় ফাইলের লেনদেন এবং ‘অফিসার’ প্রসঙ্গে উঠে আসা রহস্যের নেপথ্যের আরও তথ্য।

সম্পাদক ও প্রকাশক: খলিলুর রহমান রানা
প্রধান উপদেষ্টা: খলিলুর রহমান রানা
ঠিকানা: পল্লী নিউজ টিভিপ্রধান কার্যালয় ২১৯/২, ফকিরাপুল ১ম গলি, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।WhatsApp number 01333099183নিউজ রুম ফোন নাম্বার 01914934383E-mail pallinews83@gmail.com
যোগাযোগ: 01914934383
pallinews83@gmail.com (সাধারণ তথ্যের জন্য), pallinews83@gmail.com (সম্পাদকীয়), pallinews83@gmail.com (বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত)